in

মিশ্র অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কাকে বলে? মিশ্র অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য

মিশ্র অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য
মিশ্র অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য

বর্তমান বিশ্বে প্রধানত চার ধরনের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কার্যকর আছেঃ ধনতান্ত্রিক বা পুঁজিবাদী, সমাজতান্ত্রিক, মিশ্র ও ইসলামি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা।

নিম্নে মিশ্র অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্যসমূহ আলোচনা করা হলো।

মিশ্র অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্যসমূহ

ধনতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পাশাপাশি বর্তমানে বিশ্বে আর একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বিরাজমান। সেটি হচ্ছে মিশ্র অর্থনীতি। এটি ধনতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির কিছু কিছু বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি ব্যবস্থা। এ ব্যবস্থায় দ্রব্য উৎপাদন, বিনিয়োগ ও ভোগের ক্ষেত্রে যেমন ব্যক্তির মালিকানা স্বীকৃত, তেমনি সরকারি উদ্যোগে উৎপাদন ও বিনিয়োগের ব্যবস্থাও রয়েছে। অর্থনীতির কোন কোন খাত বা খাতের অংশবিশেষ সরকারি নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়। বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশে মিশ্র অর্থনৈতিক ব্যবস্থা রয়েছে। মিশ্র অর্থনীতির প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো নিম্নরুপঃ

সরকারি ও বেসরকারি খাতের সহাবস্থানঃ মিশ্র অর্থনীতিতে ব্যক্তিমালিকানা ও ব্যক্তি উদ্যোগের পাশাপাশি কিছু কিছু খাতে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে সরকারি মালিকানা, উদ্যোগ ও নিয়ন্ত্রণ কার্যকর থাকে। জনসাধারণের জন্য অত্যাবশ্যকীয় দ্রব্য ও সেবা, যেমন- যোগাযোগ ব্যবস্থা, চিকিৎসা ব্যবস্থা, শিক্ষার আয়োজন প্রভৃতি প্রধানত সরকারি নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়। তবে এক্ষেত্রেও আংশিক ব্যক্তিগত বা বেসরকারি উদ্যোগ দেখা যায়।

এছাড়া মৌলিক ও বৃহদায়তন শিল্প, জনগুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান, বড় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, প্রধান আমদানি ও রপ্তানি দ্রব্য, জীবন রক্ষাকারী ঔষধ, শিশুখাদ্য এসবও সাধারণত সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীনে থাকে।

আবার মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগপণ্য, যেমন- কৃষিপণ্য, কাপড় ও তৈরি পোশাক, প্রক্রিয়াকৃত খাদ্যদ্রব্য, হোটেল-রেস্তোরা, ব্যক্তিগত যানবাহন ইত্যাদি প্রধানত ব্যক্তিগত উদ্যোগে উৎপাদিত ও সরবরাহ করা হয়।

প্রতিযোগিতাঃ মিশ্র অর্থনীতিতে ব্যক্তি বা বেসরকারি খাতেরই প্রাধান্য থাকে। তাই দ্রব্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে উৎপাদকের প্রতিযোগিতা এবং দ্রব্যের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে বাজারে চাহিদা ও যোগানের স্বতঃস্ফুর্ত ক্রিয়া-বিক্রিয়া বিরাজমান। দাম ও সামর্থ্যের উপর ভিত্তি করে ক্রেতার পছন্দ ও উদ্যোক্তার বিনিয়োগ স্থির হয়।

মুনাফা অর্জনঃ মিশ্র অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সম্পত্তিতে ব্যক্তির মালিকানা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যক্তির স্বাধীনতা ও বেসরকারি খাতের প্রাধান্য থাকে। তাই উৎপাদনকারীদের সকল অর্থনৈতিক কার্যাবলির মূল উদ্দেশ্য থাকে সর্বাধিক মুনাফা অর্জন। এমনকি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন খাতসমূহও কম-বেশি মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্য দ্বারা প্রভাবিত থাকে।

তবে জনকল্যাণমূলক কার্যাবলি বিশেষত সেবামূলক অর্থনৈতিক কার্যাবলিতে (যেমন- স্বাস্থ্য, শিক্ষা সংক্রান্ত কার্যাবলি) মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্য থাকে না। আরও কিছু জনকল্যাণমূলক খাত, যেমন- টেলিযোগাযোগ, পরিবহন ইত্যাদিতে মুনাফা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা রাখা হয়।

উদ্যোক্তা ও ভোগকারীর স্বাধীনতাঃ মিশ্র অর্থনীতিতে বিশেষত জনসাধারণের ব্যবহার্য অতি প্রয়োজনীয় দ্রব্য সামগ্রীর ক্ষেত্রে একচেটিয়া ব্যবসার ওপর বিধিনিষেধ আরোপিত থাকে। ফলে এসব দ্রব্যের ক্ষেত্রে একাধিক উৎপাদনকারী প্রতিযোগিতামূলক দামে দ্রব্যটি বাজারে ছাড়তে বাধ্য হন। এতে জনসাধারণ উপকৃত হয়।

এ অর্থ ব্যবস্থায় ভোগকারী অবাধে সাধারণ দ্রব্য ক্রয়-বিক্রয় ও ভোগ করতে পারে। তবে বিশেষ অবস্থায় বা দুর্যোগকালীন সময়ে উৎপাদনে বিপর্যয় ঘটলে সরকার যে কোন দ্রব্যের ক্রয়-বিক্রয়ে পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আরোপ করতে পারে।

আয় বণ্টনঃ মিশ্র অর্থনৈতিক ব্যবস্থার উল্লিখিত বৈশিষ্ট্যের দ্বারা বণ্টনও প্রভাবিত হয়। ব্যক্তি মালিকানার পাশাপাশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি বড় অংশ, যেমন- বড় বড় কলকারখানা, ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠান, অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের উৎপাদন ও বিপণন এবং আমদানি-রপ্তানি সরকার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। অর্থনীতির ব্যক্তি মালিকানাধীন অংশ ব্যক্তির দ্বারা সম্পূর্ণরূপে মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়। এ খাতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ধনতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মতোই শ্রমিককে প্রাপ্য মজুরির চেয়ে কম মজুরি দেওয়া হয়। উদবৃত্ত মজুরি ব্যক্তির মুনাফার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ফলে উৎপাদিত সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টন হয় না। উৎপাদনের বিভিন্ন উপাদানের আয়ে বৈষম্য দেখা দেয়। এতে সমাজের সকল জনগণের সর্বাধিক কল্যাণ নিশ্চিত করা যায় না।

মিশ্র অর্থনীতিতে উৎপাদনের যে অংশ সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন, সে অংশে মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে নয় বরং সর্বাধিক সামাজিক কল্যাণ অর্জনের উদ্দেশ্যে উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এ খাতের আওতাধীন কলকারখানা ও উৎপাদন প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত শ্রমিকরা সাধারণত ন্যায্য মজুরি পায়। ফলে সম্পদের সুষম বণ্টন সম্ভব হয়।

মিশ্র অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় সম্পদ বা আয়ের আংশিক সুষ্ঠু বণ্টন ঘটে। আর অংশবিশেষে শ্রমিক শোষিত ও বঞ্চিত হয়। ফলে আয় বৈষম্য পরিলক্ষিত হয়।

আরও পড়ুন- সম্পদ কাকে বলে? সম্পদের শ্রেণিবিভাগ ও জাতীয় সম্পদের উৎস কয়টি?

আরও পড়ুন- ধনতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কাকে বলে? ধনতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য

আরও পড়ুন- সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কাকে বলে? সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্যসমূহ